আমাদের দেশে বিড়াল পোষা মানেই অনেক বাসায় এক প্লেট ভাত-মাছ আর এক বাটি দুধ। বড়রা বলেন, "বিড়াল তো সবই খায়।" কথাটা পুরোপুরি ভুল না, ক্ষুধা লাগলে বিড়াল সামনে যা পায় খেয়ে নেয়। কিন্তু সব খাবার ওর শরীরের জন্য নিরাপদ না। কিছু খাবার ধীরে ধীরে অপুষ্টি তৈরি করে, আর কিছু খাবার অল্প পরিমাণেই বিষের মতো কাজ করে।
এই লেখায় এক জায়গায় পাবেন: বিড়ালকে কী খাওয়ানো নিরাপদ, কোন খাবার কখনোই দেবেন না, বয়স অনুযায়ী দিনে কতবার খাওয়াবেন, আর ভুল কিছু খেয়ে ফেললে কী করবেন।
সংক্ষেপে উত্তর: বিড়াল মাংসাশী প্রাণী। ওর মূল খাবার হওয়া উচিত মাংস বা মাছভিত্তিক সুষম খাবার, যেমন মানসম্মত ক্যাট ফুড, অথবা তেল-মসলা ছাড়া সেদ্ধ মুরগি ও কাঁটা ছাড়া মাছ। পেঁয়াজ, রসুন, চকলেট, আঙুর-কিসমিস, চা-কফি, অ্যালকোহল আর জাইলিটলযুক্ত খাবার কখনোই দেবেন না। গরুর দুধ অনেক বিড়ালের পেট খারাপ করে।
বিড়াল কেন "সবকিছু" খেতে পারে না
মানুষ বা কুকুরের মতো বিড়াল সর্বভুক না। বিড়াল বাধ্যতামূলক মাংসাশী (obligate carnivore)। মানে ওর শরীর এমন কিছু পুষ্টি উপাদান নিজে যথেষ্ট পরিমাণে তৈরি করতে পারে না, যেগুলো আসে মূলত মাংস থেকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টরিন (taurine) আর আর্জিনিন। খাবারে এগুলোর ঘাটতি থাকলে গুরুতর, এমনকি প্রাণঘাতী রোগ হতে পারে। [Ref 1]
এ কারণেই নিরামিষ খাবার, শুধু এক ধরনের মাছ বা মাংস, কিংবা কুকুরের খাবার দিয়ে বিড়ালকে দিনের পর দিন চালানো ঠিক না। কুকুরের খাবারে বিড়ালের প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড আর ভিটামিন যথেষ্ট থাকে না। [Ref 1]
বিড়ালের জন্য নিরাপদ খাবারের তালিকা
| খাবার | কীভাবে দেবেন | খেয়াল রাখুন |
|---|---|---|
| ড্রাই ক্যাট ফুড | প্যাকেটের ফিডিং চার্ট অনুযায়ী মেপে | পাশে সবসময় পরিষ্কার পানি রাখুন |
| ওয়েট ফুড (পাউচ বা ক্যান) | এক বেলার খাবার হিসেবে, অথবা ড্রাই ফুডের সাথে মিশিয়ে | খোলার পর বেশিক্ষণ বাইরে রাখবেন না, নষ্ট হয়ে যায় |
| সেদ্ধ মুরগি | শুধু পানিতে সেদ্ধ, তেল-মসলা-লবণ ছাড়া, ছোট টুকরো করে | হাড় পুরোপুরি সরিয়ে দিন |
| সেদ্ধ মাছ | শুধু পানিতে সেদ্ধ, কাঁটা ভালো করে বেছে | ইলিশের মতো সূক্ষ্ম কাঁটার মাছে বাড়তি সাবধান |
| সেদ্ধ ডিম | মাঝে মাঝে, অল্প পরিমাণে | কাঁচা ডিম দেবেন না |
| ক্যাট ট্রিটস | পুরস্কার বা ট্রেনিংয়ের সময়, অল্প করে | মূল খাবারের বদলে নয় |
| পানি | সারাদিন পরিষ্কার পানি | প্রতিদিন বাটি ধুয়ে নতুন পানি দিন |
বাসার রান্না করা খাবার মাঝে মাঝে দেওয়া যায়। তবে শুধু মুরগি বা শুধু মাছ দিয়ে প্রতিদিনের খাবার চালালে ক্যালসিয়াম, টরিন আর ভিটামিনের ঘাটতি থেকে যায়। প্রতিদিনের মূল খাবার হিসেবে বিড়ালের জন্য তৈরি সুষম "কমপ্লিট" ক্যাট ফুড সবচেয়ে নিরাপদ। বিড়ালের বয়স অনুযায়ী ড্রাই ফুড, পাউচ আর ক্যান ফুড দেখে নিতে পারেন।
যে খাবার বিড়ালকে কখনোই দেবেন না
| খাবার | কেন বিপজ্জনক |
|---|---|
| পেঁয়াজ, রসুন, পেঁয়াজপাতা | লোহিত রক্তকণিকা নষ্ট করে রক্তশূন্যতা তৈরি করতে পারে। কুকুরের চেয়ে বিড়াল এতে বেশি সংবেদনশীল। তরকারির ঝোল আর মসলাদার খাবার এ কারণেই বিপজ্জনক। |
| চকলেট | বমি, ডায়রিয়া, অস্থিরতা, হৃৎস্পন্দনে অনিয়ম, কাঁপুনি ও খিঁচুনি হতে পারে। ডার্ক চকলেট সবচেয়ে বিপজ্জনক। |
| চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক | ক্যাফেইনে চকলেটের মতোই ঝুঁকি। |
| আঙুর ও কিসমিস | কিডনির ক্ষতি করতে পারে। |
| অ্যালকোহল ও কাঁচা খামির-মাখা আটা | বমি, শ্বাসকষ্ট, কাঁপুনি, এমনকি মৃত্যু। কাঁচা খামির পেটে গ্যাস তৈরি করে পেট ফুলিয়ে দেয়। |
| জাইলিটল (সুগার-ফ্রি চুইংগাম, কিছু ক্যান্ডি ও টুথপেস্ট) | রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে যাওয়া আর লিভারের ক্ষতির ঝুঁকি। |
| বেশি লবণাক্ত খাবার (চিপস, নোনতা স্ন্যাকস) | অতিরিক্ত পিপাসা, বমি, ডায়রিয়া, কাঁপুনি ও খিঁচুনি হতে পারে। |
| হাড় ও মাছের বড় কাঁটা | গলা বা পেটে আটকে যেতে বা ক্ষত করতে পারে। অনেক সময় অপারেশন লাগে। |
| কাঁচা মাংস ও কাঁচা ডিম | সালমোনেলা ও ই. কোলাই জাতীয় জীবাণুর ঝুঁকি। |
সূত্র: [Ref 2]
দুধ কি বিড়ালের জন্য ভালো?
এটা আমাদের দেশের সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা। বিড়ালছানা মায়ের দুধ খায় ঠিকই, কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে বেশিরভাগ বিড়ালের শরীরে দুধের ল্যাকটোজ হজম করার এনজাইম (ল্যাকটেজ) কমে যায়। ফলে গরুর দুধ খেলে অনেক বিড়ালের ডায়রিয়া বা পেটের গোলমাল হয়। [Ref 2]
মা ছাড়া এতিম বিড়ালছানাকে গরুর দুধ দেবেন না। ওদের জন্য আলাদা বিড়ালছানার দুধ (kitten milk replacer) পাওয়া যায়। এমন ছানার যত্নে অবশ্যই ভেটের পরামর্শ নিন।
ভাত-মাছ কি যথেষ্ট?
ভাত-মাছ খেয়েও অনেক বিড়াল বেঁচে থাকে, কিন্তু সুস্থভাবে বড় হয় না। ভাত মূলত শর্করা, যা বিড়ালের শরীরের তেমন দরকার নেই। এতে পেট ভরে, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রোটিন, টরিন আর ক্যালসিয়াম পায় না। আর তরকারির মাছে থাকা পেঁয়াজ, রসুন, মসলা আর লবণ উল্টো ক্ষতি করে।
বাসার খাবার দিতে চাইলে এভাবে দিন:
- মাছ বা মুরগি আলাদা করে শুধু পানিতে সেদ্ধ করুন। পরিবারের তরকারি থেকে তুলে দেবেন না।
- কাঁটা আর হাড় ভালো করে বেছে ফেলুন।
- ভাতের পরিমাণ খুব অল্প রাখুন, মাছ বা মাংস যেন বেশি থাকে।
- দিনের বেশিরভাগ বেলা সুষম ক্যাট ফুড দিন।
কাঁচা মাছ দেওয়া যাবে?
বাজার থেকে আনা কাঁচা মাছের টুকরো বিড়ালকে দেওয়ার অভ্যাস অনেক বাসায় আছে। কিছু কাঁচা মাছে থায়ামিনেজ নামের একটি এনজাইম থাকে, যা ভিটামিন বি১ (থায়ামিন) নষ্ট করে দেয়। নিয়মিত কাঁচা মাছ খেলে বিড়ালের থায়ামিনের ঘাটতি হতে পারে। [Ref 3]
শুরুতে বমি, মুখ দিয়ে লালা পড়া, খাবারে অরুচি আর ওজন কমা দেখা যায়। পরে ঘাড় নিচের দিকে বেঁকে যাওয়া, টলমল করে হাঁটা, এক জায়গায় ঘুরতে থাকা আর খিঁচুনির মতো স্নায়বিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। [Ref 3] রান্না করলে এই এনজাইম নষ্ট হয়ে যায়, তাই মাছ সবসময় সেদ্ধ করে দিন।
বয়স অনুযায়ী দিনে কতবার খাওয়াবেন
| বয়স | দিনে কতবার | কী খাবার |
|---|---|---|
| ২ থেকে ৪ মাস | ৪ বার | কিটেন ফুড। ড্রাই ফুড কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে নরম করে দেওয়া যায় |
| ৪ থেকে ৬ মাস | ৩ বার | কিটেন ফুড |
| ৬ থেকে ১২ মাস | ২ থেকে ৩ বার | কিটেন ফুড, নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ানোর অভ্যাস করান |
| ১ বছরের বেশি | ২ বার | অ্যাডাল্ট ফুড |
| ৭ বছরের বেশি | ২ বার, বা অল্প করে বেশিবার | ভেটের পরামর্শে সিনিয়র ফুড |
কতটুকু খাওয়াবেন, সেটা নির্ভর করে বিড়ালের ওজন, বয়স আর কতটা চঞ্চল তার ওপর। প্যাকেটের পেছনের ফিডিং চার্ট দিয়ে শুরু করুন, তারপর ওজন দেখে কমবেশি করুন। হাত বোলালে পাঁজরের হাড় হালকা অনুভব করা যায় কিন্তু চোখে দেখা যায় না, এমন হলে ওজন ঠিক আছে।
ড্রাই ফুড নাকি ওয়েট ফুড?
দুটোরই সুবিধা আছে। ড্রাই ফুড সাশ্রয়ী, রাখা সহজ, অনেকক্ষণ বাটিতে রেখে দেওয়া যায়। ওয়েট ফুড (পাউচ, ক্যান) বিড়ালের কাছে সাধারণত বেশি সুস্বাদু, আর এতে পানির ভাগ বেশি, তাই যে বিড়াল কম পানি খায় তার জন্য ভালো। তবে ওয়েট ফুড সারাদিন বাইরে ফেলে রাখা যায় না, নষ্ট হয়ে যায়। [Ref 1]
অনেকে দুটো মিলিয়ে দেন: দিনে এক বেলা পাউচ বা ক্যান, অন্য বেলা ড্রাই ফুড। শুধু ড্রাই ফুড দিলে পানির বাটি সবসময় ভরা রাখুন।
খাবার বদলানোর সঠিক নিয়ম
হঠাৎ এক ব্র্যান্ড থেকে আরেক ব্র্যান্ডে গেলে অনেক বিড়ালের বমি বা ডায়রিয়া হয়। তাই ৭ থেকে ১০ দিন ধরে ধীরে ধীরে বদলান:
- ১ থেকে ৩ দিন: পুরোনো খাবার ৭৫% + নতুন খাবার ২৫%
- ৪ থেকে ৬ দিন: পুরোনো ৫০% + নতুন ৫০%
- ৭ থেকে ৯ দিন: পুরোনো ২৫% + নতুন ৭৫%
- ১০ম দিন থেকে: পুরোপুরি নতুন খাবার
এর মধ্যে বমি, ডায়রিয়া হলে বা খাওয়া বন্ধ করলে বদলানো থামিয়ে ভেটের পরামর্শ নিন।
ভুল কিছু খেয়ে ফেললে কী করবেন
- বিড়াল কী খেয়েছে, কতটুকু আর কখন খেয়েছে লিখে রাখুন। মোড়ক থাকলে সাথে রাখুন।
- দেরি না করে কাছের ভেট বা পশু হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।
- ভেটের পরামর্শ ছাড়া নিজে বমি করানোর চেষ্টা করবেন না, লবণ-পানি বা তেল খাওয়াবেন না। এতে উল্টো ক্ষতি হতে পারে।
- বমি, ডায়রিয়া, অতিরিক্ত লালা, কাঁপুনি, শ্বাসকষ্ট বা খিঁচুনি দেখলে সেটা জরুরি অবস্থা। সাথে সাথে ভেটের কাছে নিন।
প্রায়ই জিজ্ঞেস করা প্রশ্ন
বিড়ালকে কি প্রতিদিন ভাত খাওয়ানো যায়?
অল্প ভাত মাঝে মাঝে ক্ষতি করে না, কিন্তু প্রতিদিনের মূল খাবার হিসেবে ভাত ঠিক না। বিড়ালের দরকার প্রোটিন, ভাত শুধু পেট ভরায়।
বিড়ালকে কি ডিম খাওয়ানো যায়?
হ্যাঁ, ভালো করে সেদ্ধ ডিম মাঝে মাঝে অল্প দেওয়া যায়। কাঁচা ডিমে জীবাণুর ঝুঁকি আছে, তাই কাঁচা ডিম দেবেন না।
বিড়াল কি কুকুরের খাবার খেতে পারে?
এক-আধবার খেয়ে ফেললে সমস্যা নেই, কিন্তু নিয়মিত না। কুকুরের খাবারে বিড়ালের প্রয়োজনীয় পুষ্টি যথেষ্ট থাকে না।
বিড়ালকে কি শুধু মাছ খাওয়ানো যায়?
না। শুধু এক ধরনের মাছ বা মাংস দিয়ে দিনের পর দিন চালালে পুষ্টির ঘাটতি হয়। মাছ দিলে সেদ্ধ করে, কাঁটা বেছে, অন্য খাবারের পাশাপাশি দিন।
বিড়াল খাবার খাচ্ছে না, কী করব?
একদিনের বেশি কিছু না খেলে দেরি করবেন না, ভেটের কাছে নিন। বিশেষ করে মোটা বিড়াল কয়েকদিন না খেলে লিভারের গুরুতর সমস্যা হতে পারে। খাওয়া বন্ধের সাথে বমি আর পাতলা পায়খানা থাকলে প্যানলিউকোপেনিয়ার মতো মারাত্মক রোগও হতে পারে। আমাদের পুঁটির গল্পটা পড়ুন: টিকা না দেওয়ায় পুঁটিকে হারিয়েছি।
শেষ কথা
বিড়ালের সুস্থতার শুরু ওর খাবারের বাটি থেকে। মাংসভিত্তিক সুষম খাবার, পরিষ্কার পানি, আর পেঁয়াজ-রসুন-চকলেট-দুধ থেকে দূরে রাখা, এই তিনটা মানলেই অনেক রোগ এড়ানো যায়। খাবারের পাশাপাশি সময়মতো টিকা আর কৃমির ঔষধও সমান জরুরি। বয়স অনুযায়ী পুরো সময়সূচি দেখুন: বিড়ালের টিকা ও কৃমির ঔষধের সময়সূচি।
আপনার বিড়াল কোন খাবার সবচেয়ে ভালোবাসে? কমেন্টে জানান।
এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য। আপনার বিড়ালের নির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় রেজিস্টার্ড ভেটের পরামর্শ নিন।
তথ্যসূত্র
- Best Friends Animal Society, "Feeding Your Cat". bestfriends.org
- ASPCA Animal Poison Control, "People Foods to Avoid Feeding Your Pets". aspca.org
- PetMD, "Vitamin B1 (Thiamine) Deficiency in Cats". petmd.com
Cat Food
Cat Litter
Cat Accessories
Cat Care and Health
0 Comments
No comments yet. Be the first to share your thoughts.